সিলেট ১২ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ২৯শে মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ, ২৪শে শাবান, ১৪৪৭ হিজরি

মৌলভীবাজার-২ আসনে দুই স্বতন্ত্র প্রার্থীর দাপট

প্রকাশিত ফেব্রুয়ারি ১১, ২০২৬, ০২:৩৫ অপরাহ্ণ
মৌলভীবাজার-২ আসনে দুই স্বতন্ত্র প্রার্থীর দাপট

নিজস্ব প্রতিবেদক : 

মৌলভীবাজার জেলার কুলাউড়া উপজেলা নিয়ে গঠিত মৌলভীবাজার-২ সংসদীয় আসন। এবারের সংসদ নির্বাচনে দেশ জুড়ে যখন বিএনপি বনাম জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের প্রতিদ্বন্দিতা চলছে, সেখানে চায়ের দেশের এই আসনে দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন দুই স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য পদপ্রার্থী ফুটবলমার্কা নিয়ে সাবেক সংসদ সদস্য নবাব আব্বাস আলী খান এবং কাপপিরিচ মার্কা নিয়ে সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান ফজলুল হক খান সাহেদ।

 

বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর বসবাস কুলাউড়ায়। ২৪টি চা-বাগানের শ্রমিক, ৩০টি খাসিয়াপুঞ্জির খাসিয়া ও গারো সম্প্রদায়ের লোকজন, হাকালুকির জেলে সম্প্রদায়ের বৃহৎ একটি অংশ এ আসনের ভোটার। কুলাউড়ায় মোট ভোটার ৩ লাখ ৩ হাজার ২০ জন। পোস্টাল ব্যালটে ভোট দেবেন ৫ হাজার ৫৮৮ জন। ভোটার তালিকা বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এই আসনে চা-শ্রমিক ভোটার রয়েছেন প্রায় ২৯ হাজার। ফলে এসকল জনগোষ্ঠীর ভোট নিয়ে প্রার্থীদের মধ্যেও রয়েছে প্রবল আগ্রহ।

 

একটিমাত্র উপজেলা নিয়ে এই নির্বাচনী আসন, এই নির্বাচনী এলাকাতেই উপজেলা চেয়ারম্যান ও ভাইস চেয়ারম্যান পদে তিন বারের নির্বাচিত তরুণ প্রার্থী ফজলুল হক খান সাহেদ এবার এই অঞ্চলের প্রভাবশালী ফুলতলী পীরের অনুসারীদের সংগঠন আনজুমানে আল ইসলাহর সমর্থন নিয়ে স্বতন্ত্র নির্বাচন করছেন। দীর্ঘদিনের জনসম্পৃক্ততা এবং ক্লিন ইমেজের সুনামের পাশাপাশি তার সংগঠন আনজুমানে আল ইসলাহ ও ছাত্র সংগঠন তালামীযে ইসলামিয়ার বিশাল কর্মীবাহিনী এবারের নির্বাচনে তাকে যথেষ্ট সুবিধা দিচ্ছে। স্থানীয় নির্বাচনে বারবার জয়ী হলেও কোন ধরনের বদনাম কুড়াননি এই তরুণ রাজনীতিক, বরং দুঃসময়ে এলাকাবাসীর পাশে দাঁড়ানোর জন্য তার প্রতি নির্বাচনী এলাকার জনগণের বিশেষ সমর্থন কাজ করছে। পরিচ্ছন্ন রাজনীতির সুবাদে কুলাউড়ার খাসিয়া-গারো এবং চা-শ্রমিক জনগোষ্ঠীর মধ্যেও তার গ্রহণযোগ্যতা সৃষ্টি হয়েছে, এ আসনে যারা অন্যতম নির্ণায়কের ভূমিকায় থাকেন। অন্যান্য প্রার্থীদের বিচ্ছিন্ন নানা প্রতিশ্রুতির ভীড়ে কুলাউড়া নিয়ে তার পরিকল্পনা বর্ণনা করে ইশতেহার প্রকাশ করেও নজর কেড়েছেন এই প্রার্থী।

 

তরুণ এই রাজনীতিবিদের প্রতিদ্বন্দী আরেক স্বতন্ত্র প্রার্থী নওয়াব আলী আব্বাছ খান। জাতীয় পার্টির লাঙল প্রতীক নিয়ে তিন বার সংসদ সদস্য পদে বিজয়ী এই প্রবীণ রাজনীতিবিদ বর্তমানে জাতীয় পার্টির কাজি জাফর গ্রুপের কেন্দ্রীয় নেতা, সে সুবাদে বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যাশীও ছিলেন। সজ্জন রাজনীতিবিদ হিসেবে পরিচিত নওয়াব আলী আব্বাছ খান বিএনপির সমর্থন পেলে এবার হয়তো অপ্রতিদ্বন্দী হয়ে উঠতেন, তবে দলীয় সমর্থন ছাড়াই কুলাউড়ায় তার ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা ভোটের মাঠে যথেষ্ট শক্তিশালি। যদিও তার নিজ ইউনিয়ন পৃথিমপাশা ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক জনপ্রিয় চেয়ারম্যান জিমিউর রহমান ম্যান্ডেলা স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে নওয়াব আলী আব্বাছ খানকে কিছুটা বিপাকে ফেলে দিয়েছেন বলা চলে, জিমিউর রহমান কুলাউড়া জুড়ে নওয়াব আলী আব্বাছ খানের মতো শক্তিশালী প্রার্থী হয়ে উঠতে না পারলেও পৃথিমপাশায় তার ভোটে ভাগ বসানোর আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

 

দুই হেভিওয়েট স্বতন্ত্র প্রার্থীর সাথে নির্বাচনী লড়াইয়ে মাঠে আছেন বিএনপি মনোনীত প্রার্থী শওকতুল ইসলাম শকু। বড় দলের মনোনয়নের সুবিধা যেমন তিনি পাচ্ছেন নির্বাচনী লড়াইয়ে, তেমনি দলীয় অন্তর্কোন্দলে বিপাকেও পড়তে হচ্ছে তাকে। দলীয় শীর্ষ নেতৃত্বের অনুরোধে শেষ পর্যন্ত আরেক প্রভাবশালী বিএনপি নেতা ও মনোনয়নপ্রত্যাশী আবেদ রাজা নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ালেও এখনো নির্বাচনী মাঠে আবেদের সমর্থকদের স্বতস্ফূর্ত সমর্থন পাচ্ছেন না শকু। ফলে ব্যালটে বিদ্রোহী প্রার্থী না থাকলেও খানিকটা বিভক্ত বিএনপি নিয়েই লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন ধানের শীষের এই প্রার্থী। তবে শেষ অবধি আবেদ রাজাসহ স্থানীয় বিএনপির সব গ্রুপের সর্বাত্মক সমর্থন পেলে তিনিও ত্রিমুখী লড়াইয়ের অন্যতম প্রতিদ্বন্দী হয়ে উঠতে পারেন বলে স্থানীয়দের ধারণা। অবশ্য দুই দাপুটে স্বতন্ত্র প্রার্থীর মতো নির্বাচনী রাজনীতিতে তার সাফল্যের ইতিহাস নেই, এর আগে কোন নির্বাচনেই তিনি বিজয়ী হতে পারেননি।

 

জুলাই অভ্যুত্থান পরবর্তী দেশের জাতীয় রাজনীতিতে জামায়াত অন্যতম প্রধান শক্তি হয়ে উঠলেও আমিরে জামায়াত ডা. শফিকুর রহমানের জন্মভূমি কুলাউড়ায় এখনো সেই শক্তি অর্জন করতে পারেনি জামায়াত। ডা. শফিক কুলাউড়ায় একাধিকবার নির্বাচন করে পরাজয় বরণ করলেও এবার আর তিনি এ আসনে নির্বাচনের ঝুঁকি নেননি, এখানে মনোনয়ন দিয়েছেন জেলা জামায়াতের আমির ইঞ্জিনিয়ার সায়েদ আলীকে। সায়েদ আলী জামায়াতি রাজনীতিতে অত্যন্ত গ্রহণযোগ্য নেতা হলেও কুলাউড়ার নির্বাচনী রাজনীতিতে তার তিনি কেবল জামায়াত প্রার্থী হিসেবেই পরিচিত, সেই জামায়াতেরও এই এলাকায় নির্বাচনী ইতিহাস শোচনীয়।  জামায়াত-শিবিরের বিশাল কর্মী বাহিনীর সক্রিয়তা সত্ত্বেও নির্বাচনী লড়াইয়ের সম্মুখে পৌঁছা তার জন্যে তাই খুব একটা সহজ হচ্ছে না। অবশ্য পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতায় আগের চেয়ে জামায়াতের নির্বাচনী ফলাফলের কিছুটা উন্নতি হতে পারে বলে ধারণা করছেন অনেকেই।

 

এছাড়া কুলাউড়ায় প্রচার চালিয়ে যাচ্ছেন এম জিমিউর রহমান চৌধুরী (স্বতন্ত্র), বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল বাসদের (মার্কসবাদী) সাদিয়া নোশিন তাসনিম চৌধুরী, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মাওলানা আব্দুল কুদ্দুস এবং জাতীয় পার্টির প্রার্থী আব্দুল মালিক।