
জাহিদ হাসান
লেখক, মুক্তচিন্তক, সমাজসেবক ও সোশ্যাল অ্যাক্টিভিস্ট
ধর্ম যখন রাজনীতির ‘ব্র্যান্ড নেম’
দৃষ্টিভঙ্গি |রাজনৈতিক ব্যবচ্ছেদ
মানুষের আদিমতম দুর্বলতার নাম ‘বিশ্বাস’। আর এই বিশ্বাসকে যখন সুনিপুণভাবে প্রক্রিয়াজাত করে ক্ষমতার সিঁড়ি বানানো হয়, তখন তাকে বলা হয় ‘ধর্মীয় রাজনীতি’। বর্তমান বিশ্বে বড় বড় রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে ধর্ম আর আধ্যাত্মিক সাধনার পথ নয়; বরং এটি জনতাকে সম্মোহিত রাখার এক শক্তিশালী ‘অ্যানেস্থেশিয়া’।
১. আস্থার সংকট ও অলৌকিকতার ইনজেকশন
একটি আধুনিক রাষ্ট্রের ভিত্তি হওয়া উচিত অর্থনৈতিক মুক্তি ও সামাজিক নিরাপত্তা। কিন্তু যখন শাসকগোষ্ঠী জনগণের অন্ন, বস্ত্র ও সুশাসনের নিশ্চয়তা দিতে ব্যর্থ হয়, তখন তারা ‘ধর্ম রক্ষাকারী’র মুখোশ পরে মঞ্চে হাজির হয়।
রাজনীতিবিদদের কাছে উপাসনালয় এখন কেবল প্রার্থনার জায়গা নয়, বরং একেকটি বিশাল ‘ভোটব্যাংক’।
ধর্ম যখন রাজনীতির চালিকাশক্তি হয়, তখন প্রশ্ন করাকে ‘পাপ’ হিসেবে গণ্য করা হয়। ফলে শাসকের দুর্নীতি বা ব্যর্থতা নিয়ে কথা বলাই হয়ে দাঁড়ায় ‘ধর্মবিরোধিতা’। এই কৌশলেই সাধারণ মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক শ্বাসরোধ করা হয়।
২. ‘ধর্মবিরোধী’ কার্ড: চরিত্র হননের নোংরা খেলা
আজ রাজনীতির মাঠে নীতি-আদর্শের লড়াই নেই; চলছে কে কত বড় ‘ধর্মপ্রাণ’—তার প্রতিযোগিতা।
প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে সবচেয়ে সহজ ও কার্যকর অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে ‘ধর্মবিরোধী’ বা ‘নাস্তিক’ ট্যাগ। মুক্তমনা লেখকদের লেখা ঘিরে সৃষ্ট উত্তেজনাকে রাজনৈতিক ঢাল বানিয়ে বোঝানো হয়—বিপক্ষ ক্ষমতায় এলে ‘ধর্ম বিপন্ন’ হবে।
সমাজকে ‘মুমিন বনাম কাফের’ বা ‘আস্তিক বনাম নাস্তিক’—এই দুই মেরুতে ভাগ করা হয়। ফলে মানুষ মুদ্রাস্ফীতি, বেকারত্ব ও স্বাস্থ্যসেবার মতো বাস্তব সমস্যা ভুলে গিয়ে একে অপরের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়।
৩. আধ্যাত্মিকতার মোড়ক, পকেট ভরার উৎসব
ধর্মীয় রাজনীতির সবচেয়ে বড় ভণ্ডামি হলো—যারা ধর্মের দোহাই দিয়ে ক্ষমতায় বসে, তাদের জীবনযাপন ধর্মীয় নীতির সম্পূর্ণ বিপরীত।
জনতা যখন ‘পরকালের জান্নাত’-এর আশায় মিছিলে ঘাম ঝরায়, তখন শাসকেরা রাষ্ট্রের অর্থ পাচার করে ইহকালেই নিজেদের জন্য ‘স্বর্গ’ বানায়।
রাজনীতিবিদরা কিছু ধর্মগুরুকে অর্থ ও প্রভাব দিয়ে পোষে। এই তথাকথিত ‘ধর্মীয় ঠিকাদাররা’ ফতোয়ার মাধ্যমে শাসকের অন্যায়কে ধর্মীয় বৈধতা দেয়।
“শাসক যখন হাতে ধর্মগ্রন্থ নিয়ে রাজপথে দাঁড়ায়, তখন বুঝে নেবেন—আপনার মগজ ও সম্পদ, উভয়ই লুণ্ঠিত হতে চলেছে।”